চীন সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ২৮টি কোম্পানির ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিরক্ষা খাতের বৃহৎ প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন ও বোয়িং ডিফেন্স। ২০২৫ সালের শুরুতেই এই সিদ্ধান্ত নতুন করে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে বাণিজ্যযুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুনরায় দায়িত্ব নিতে চলেছেন। এমন সময় এই ঘোষণা দুই দেশের মধ্যে নতুন উত্তেজনার সূত্রপাত করেছে।

এর আগে ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারণায় চীনের বিরুদ্ধে কঠোর নীতি নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ছিল চীনা পণ্যের ওপর ৬০ শতাংশ শুল্ক আরোপ, চীনা বিনিয়োগে কঠোর নজরদারি এবং নিষেধাজ্ঞা জোরদার করা। চীনও এই রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরিষ্কার বার্তা দিয়েছে যে, তারাও যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের জবাব দিতে প্রস্তুত।

ট্রাম্পের পূর্ববর্তী শাসনামলে তার বাণিজ্যনীতি ছিল ‘জিরো-সাম গেম’। ওই সময় আরোপিত শুল্ক এবং বাণিজ্য বাধাগুলি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল। পাল্টা পদক্ষেপে চীনও শুল্ক বাড়িয়েছিল। ফলে ২০১৯ সালের মধ্যে উভয় দেশ একটি তীব্র বাণিজ্যযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, যার প্রভাব শিল্প খাত ও বিনিয়োগকারীদের ওপর পড়ে।

২০২৫ সালের নতুন প্রেক্ষাপট

২০২৫ সালের অর্থনৈতিক চিত্র আরও জটিল। মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানি সংকট এবং যুদ্ধের আশঙ্কা বিশ্ব অর্থনীতিকে চাপে রেখেছে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনার পুনরুত্থান এই সংকটকে আরও তীব্র করতে পারে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীরা চীনা ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডে নতুন নিয়ম মেনে চলার জন্য চাপের মধ্যে রয়েছেন। ২ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়া বিধান অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বা সেনাবাহিনীতে ব্যবহৃত প্রযুক্তি উন্নয়নকারী চীনা কোম্পানিতে বিনিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই বিধানের অধীনে সেমিকন্ডাক্টর, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং বা সামরিক প্রযুক্তিতে জড়িত প্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের আশঙ্কা

বিশ্লেষকগণ মনে করছেন, এই উত্তেজনা একটি প্রতিশোধমূলক চক্রে পরিণত হতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন বেইজিংয়ের সাম্প্রতিক রপ্তানি নিয়ন্ত্রণকে শুধু প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে দেখবে না। বরং তারা চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর আরও কঠোর শর্ত আরোপ করতে পারে।

চীনও পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে। এটি হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানিগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ কিংবা নতুন অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ আরোপ। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু অর্থনৈতিক নয়, আদর্শগত লড়াইয়েও পরিণত হতে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতির ওপর প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মধ্যে উত্তেজনা অন্যান্য দেশকেও প্রভাবিত করবে। বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো। অনেক দেশই যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ের সঙ্গেই রপ্তানিনির্ভর। তাই তারা কোনো একটি পক্ষকে হারাতে চায় না। তবে সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাত এবং বাণিজ্য প্রবাহে পরিবর্তন এই দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি থামিয়ে দিতে পারে।

সমাধানের পথ কি?

২০২০ সালে স্বাক্ষরিত ফেজ ওয়ান চুক্তির মতো সাময়িক সমঝোতা সম্ভব। তবে এটি শুধু সমস্যার উপসর্গ কমাবে, মূল কারণ নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত লক্ষ্য সম্পর্কে পারস্পরিক সম্মান ও স্পষ্ট নিয়ম তৈরি ছাড়া স্থায়ী সমাধান অসম্ভব।

পাশাপাশি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) একটি ভূমিকা রাখতে পারে, যদিও তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বেসরকারি খাতও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এটা স্পষ্ট যে, চলতি বছরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বড় একটি পরীক্ষার মুখোমুখি। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন কীভাবে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা পরিচালনা করবে, তার ওপরই নির্ভর করবে বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ।

এই মুহূর্তে যেই পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে, তা আরও উত্তেজনার দিকে যাচ্ছে। চীনের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা এবং ট্রাম্পের সম্ভাব্য শুল্ক নীতি ২০২৫ সালের জন্য অস্থির অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *